এম. মনছুর আলম, চকরিয়া:
টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে গেছে। এতে দুই উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বন্যার পানিতে ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার ফসলি জমি, আমনের বীজতলা, আউশ ধান এবং গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন সবজির ক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় দুই উপজেলার কৃষি খাতে প্রায় ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের স্বপ্নের সবজি ক্ষেত ও ধানের জমি এখন কাদামাটি আর পানিতে ডুবে আছে। বাজারে তোলার অপেক্ষায় থাকা সবজি এক নিমিষেই নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরসহ দুই উপজেলায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে কাঁকরোল, তিতকরলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, বরবটি, শসাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৬০ হেক্টর জমির সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।
এছাড়া চলতি মৌসুমে দুই উপজেলায় ১ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের বীজতলা ও আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৩৫ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ১০০ হেক্টর এবং আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে ৯৬০ হেক্টর। এছাড়া ৬ হেক্টর পানের বরজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় হাজারো কৃষক সবজি চাষ করেন। অনেকেই ক্ষেত থেকে সবজি তুলে বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের বন্যা তাদের সব স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, বমুবিলছড়ি, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, বিএমচর, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার নদীতীরবর্তী এলাকা।
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের কৃষক জোনায়েদ জানান, ৪০ শতক জমিতে বরবটি, চিচিঙ্গা, তিতকরলা ও শসা চাষে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন। ফলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে।
কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খিলছাদক এলাকার কৃষক মহিউদ্দিন বলেন, ৬০ শতক জমিতে ঢেঁড়স, কাঁকরোল ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন। ফলন বাজারে তোলা শুরু করলেও ভয়াবহ বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। এতে তাঁর প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, কাকারা ইউনিয়ন মাতামুহুরী নদীবেষ্টিত হওয়ায় এখানে ব্যাপক সবজি চাষ হয়। এবারের বন্যায় সবজি চাষিদের মাথায় হাত উঠেছে।
সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তরুণ বিএনপি নেতা সাইফুল কবির চৌধুরী বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পুরো ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা বর্গাচাষী সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন পুতু বলেন, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় রোপা আমনের বীজতলা, আউশ ধান ও বিভিন্ন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে দ্রুত বিনামূল্যে বীজ, সার ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় আগামীতে এ অঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, ভয়াবহ বন্যায় দুই উপজেলায় কৃষি খাতে প্রায় ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। রোপা আমন, আউশ, বীজতলা এবং বিভিন্ন সবজির আবাদ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারিভাবে তাদের প্রণোদনা, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তারা আবারও চাষাবাদ শুরু করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।
